অন্ধবধূ কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা – যতীন্দ্রমোহন বাগচী

যতীন্দ্রমোহন বাগচীর “অন্ধবধূ” কবিতাটির এই অংশটি অন্ধত্বের মাঝেও জীবনকে উপভোগ করার পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। কবিতাটি অন্ধ বধূর মনের ভাবনা ও প্রকৃতির সাথে তার সম্পর্ক ফুটিয়ে তোলে। নিচে অন্ধবধূ কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা দেওয়া হল।

অন্ধবধূ কবিতার মূলভাব

“অন্ধবধূ” কবিতাটি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীর জীবনগাথা বর্ণনা করে। কবিতার অন্ধবধূ চোখে দেখতে পায় না, কিন্তু তার অন্যান্য ইন্দ্রিয় অত্যন্ত প্রখর – পায়ের তলায় পড়ে থাকা বকুল ফুলের নরম স্পর্শ সে টের পায়, কোকিলের ডাক শুনে ঋতু পরিবর্তন বুঝতে পারে। সমাজ তাকে অবহেলা করে, কেউ তার কষ্ট বোঝে না, বরং “চোখ গেল” বলে উপহাস করে। তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনও তাকে সহানুভূতি দেখায় না। অথচ প্রকৃতি তার সত্যিকারের বন্ধু – দিঘির জলের শীতল স্পর্শ, গাছের ডালে ফুল ফোটা, এসবই তাকে সাময়িক স্বস্তি দেয়। কবিতাটিতে অন্ধত্বকে শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে নয়, বরং সমাজের নির্মম দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হিসেবেও চিত্রিত করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বধূটি তার মনের জোরেই টিকে থাকে, যদিও কেউ তাকে বুঝতে চায় না। কবি এখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি সমাজের দায়িত্ব ও সহমর্মিতার কথা স্পষ্ট করেছেন।

অন্ধবধূ কবিতার ব্যাখ্যা

কবিতার লাইনব্যাখ্যা
“পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী!
আস্তে একটু চল না ঠাকুরঝি—”
এখানে অন্ধ বধূটি অনুভব করছে যে তার পায়ের নিচে কিছু একটা নরম জিনিস পড়েছে। যেহেতু সে দেখতে পায় না, তাই সে তা বুঝতে চেষ্টা করছে।
সে তার সঙ্গী বা পরিচিত কাউকে বলছে, ধীরে হাঁটতে। কারণ সে বুঝতে চায়, পায়ের নিচে কী রয়েছে।
“ওমা, এ যে ঝরা-বকুল। নয়?
তাই তো বলি, বসে দোরের পাশে,”
সে বুঝতে পারল, তার পায়ের নিচে পড়া জিনিসটি ঝরে যাওয়া বকুল ফুল। দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও স্পর্শ দিয়ে সে তা বুঝতে পারে।
সে ব্যাখ্যা করছে যে রাতে দরজার পাশে বসে সে অনুভব করেছিল যে বকুল গাছের নিচে অনেক ফুল ঝরে পড়েছে।
“রাত্তিরে কাল— মধুমদির বাসে
আকাশ-পাতাল— কতই মনে হয়।”
রাতে বাতাসে বকুল ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল, তাই সে বুঝতে পেরেছিল যে অনেক ফুল ঝরে পড়েছে।
তার মনের মধ্যে নানা ধরনের ভাবনা আসে। হয়তো সে পুরনো স্মৃতি মনে করছে, অথবা তার ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে ভাবছে।
“জ্যৈষ্ঠ আসতে ক-দিন দেরি ভাই—
আমের গায়ে বরণ দেখা যায়?”
সে জানতে চাইছে, গ্রীষ্মের জ্যৈষ্ঠ মাস আসতে আর কতদিন বাকি? আমের গায়ে হলুদ আভা দেখা যাচ্ছে কি না? যেহেতু সে দেখতে পায় না, তাই অন্যের কাছে জানতে চায়।
“অনেক দেরি? কেমন করে হবে।”সে অবাক হয়ে বলে, “এটা কিভাবে সম্ভব? আমি তো অনেক দিন আগেই কোকিলের ডাক শুনেছি!” অর্থাৎ, তার অনুভূতি তাকে বলছে যে গ্রীষ্ম চলে এসেছে।
“কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে,
দখিন হাওয়া বন্ধ কবে ভাই;”
সে বলছে, অনেক দিন আগেই কোকিল ডাকতে শুরু করেছে এবং দক্ষিণ দিক থেকে বাতাসও বইছে, যা গ্রীষ্মের আগমনের ইঙ্গিত দেয়।
“দীঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে—
শ্যাওলা-পিছল এমনি শঙ্কা লাগে,
পা-পিছলিয়ে তলিয়ে যদি যাই!”
সে বলছে, দীঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেখানে শ্যাওলা জমেছে। ফলে যদি সে সেখানে হাঁটে, তাহলে পিছলে গিয়ে পানিতে পড়ে যেতে পারে।
“মন্দ নেহাত হয় না কিন্তু তায়—
অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যায়!”
এখানে কবিতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক কথা বলা হয়েছে। অন্ধ বধূ বলছে, যদি সে সত্যিই পানিতে পড়ে যায় এবং মারা যায়, তবে তা খুব খারাপ হবে না। কারণ তখন তার অন্ধত্বের কষ্টও শেষ হয়ে যাবে!
“দুঃখ নাইকো সত্যি কথা শোন,
অন্ধ গেলে কী আর হবে বোন?”
সে তার সঙ্গীকে বলছে যে, সে যদি মারা যায়, তাহলে বিশেষ কিছু হবে না। কারণ সে এমনিতেই অন্ধ, তার জন্য কেউ দুঃখিত হবে না।
“বাঁচবি তোরা দাদা তো তোর আগে?”সে তার দিদিকে (বা অন্য কাউকে) বলছে, “তুমি তো বেঁচে থাকবে, দাদাও বেঁচে থাকবে, তাই আমার না থাকাটা কোনো ব্যাপার নয়।”
“এই আষাঢ়েই আবার বিয়ে হবে,
বাড়ি আসার পথ খুঁজে না পাবে—
দেখবি তখন প্রবাস কেমন লাগে?”
সে বুঝতে পারছে, তার স্বামীর আবার বিয়ে হতে চলেছে। তাই স্বামী যখন নতুন বউ নিয়ে আসবে, তখন তার প্রতি আর কোনো ভালোবাসা থাকবে না। তখন সে নিজেও বুঝবে, প্রবাস (অর্থাৎ অন্ধকার জীবন) কেমন লাগে!
“‘চোখ গেল’ ওই চেঁচিয়ে হলো সারা।”সে বলছে, যখন তার চোখ নষ্ট হয়ে গেল, তখন সবাই শুধু চিৎকার করল—”ওরে, ওর চোখ গেল!” কিন্তু তাতে তার কোনো লাভ হয়নি।
“আচ্ছা দিদি, কী করবে ভাই তারা—
জন্ম লাগি গিয়েছে যার চোখ!”
সে দিদিকে বলছে, যারা জন্ম থেকে অন্ধ, তাদের জন্য তো এমন চিৎকারও হয় না! তাই সে বুঝতে পারে না, তার চোখ যাওয়াটা এত বড় ঘটনা কেন!
“কাঁদার সুখ যে বারণ তাহার ছাই!
কাঁদতে পেলে বাঁচত সে যে ভাই,
কতক তবু কমত যে তার শোক।”
এই অংশটি অত্যন্ত করুণ! সে বলছে, যদি সে কাঁদতে পারত, তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও তার দুঃখ কমত। কিন্তু তার তো কাঁদার অধিকারও নেই! কারণ দৃষ্টিহীনদের কষ্টের প্রতি কেউ সহানুভূতি দেখায় না।
“‘চোখ গেল’— তার ভরসা তবু আছে—
চক্ষুহীনার কী কথা কার কাছে!”
যাদের দৃষ্টিশক্তি ছিল কিন্তু পরে নষ্ট হয়েছে, তাদের জন্য মানুষ করুণা দেখায়। কিন্তু যারা জন্ম থেকে অন্ধ, তাদের কথা কেউ ভাবে না!
“টানিস কেন? কিসের তাড়াতাড়ি—”সে তার সঙ্গীকে বলছে, “কেন আমাকে টানছ? কীসের এত তাড়া?” সে যেন এখানে আরও কিছুক্ষণ থাকতে চায়।
“সেই তো ফিরে যাব আবার বাড়ি,
একলা-থাকা— সেই তো গৃহকোণ—”
সে জানে, যেখানেই যাক না কেন, তাকে আবার তার একাকী, নিঃসঙ্গ ঘরে ফিরে যেতেই হবে।
“তার চেয়ে এই স্নিগ্ধ শীতল জলে
দুটো যেন প্রাণের কথা বলে—
দরদ-ভরা দুখের আলাপন;”
সে বলছে, এই ঠান্ডা জল যেন তার সঙ্গী, যার মধ্যে সে তার দুঃখের কথা বলতে পারে। কারণ মানুষ তো তার কথা শোনে না!
“পরশ তাহার মায়ের স্নেহের মতো
ভুলায় খানিক মনের ব্যথা যত।”
জলের শীতলতা যেন তার মায়ের স্নেহের স্পর্শের মতো, যা সামান্য হলেও তার দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।

আরও পড়ুনঃ কপোতাক্ষ নদ কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা

Related Posts

Leave a Comment