আবুল মনসুর আহমদের “আদুভাই” গল্প, যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা, মানুষের অদম্য আশাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আদুভাই—একজন চিরন্তন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। নিচে আদু ভাই গল্পের মূলভাব ও বিষয়বস্তু দেওয়া হল।
আদু ভাই গল্পের মূলভাব
আবুল মনসুর আহমদের “আদুভাই” গল্পে আমরা এক অসাধারণ চরিত্রের সাথে পরিচিত হই – আদুভাই, যিনি বছরের পর বছর একই ক্লাস সেভেনে পড়ে থাকেন। তিনি স্কুলের সবচেয়ে নিয়মিত ছাত্র, যিনি কখনো অনুপস্থিত থাকেন না এবং প্রতিবছর দুটি পুরস্কার পান – উপস্থিতি ও সচ্চরিত্রের জন্য। আদুভাইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তার অটুট আত্মবিশ্বাস; তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন একদিন সব বিষয়ে দক্ষ হয়ে প্রমোশন পাবেন। গল্পের বর্ণনাকারীর সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যদিও একজন ক্লাসের সেরা ছাত্র অন্যজন সবচেয়ে খারাপ। সংকট শুরু হয় যখন আদুভাইয়ের ছেলে একই শ্রেণিতে পাশ করে এবং তার স্ত্রী তাকে চাপ দেন প্রমোশন নেওয়ার জন্য। শিক্ষকদের কাছে সুপারিশ করতে গিয়ে দেখা যায় আদুভাইয়ের খাতাগুলোতে অদ্ভুত সব উত্তর রয়েছে – ফারসি খাতায় বাংলা লেখা, অঙ্কের খাতায় প্রশ্নের সমালোচনা। হতাশ আদুভাই শেষ পর্যন্ত স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আবেগময় বক্তৃতা দেন। গল্পের করুণ সমাপ্তিতে আমরা জানতে পারি আদুভাই অবশেষে প্রমোশন পেলেও মারা গেছেন, তার সমাধিফলকে লেখা হয়েছে এই অর্জনের কথা।
আদু ভাই গল্পের বিষয়বস্তু
আদুভাই ছিলেন আমাদের স্কুলের এক কিংবদন্তি চরিত্র। তিনি ক্লাস সেভেনে পড়তেন – না, পড়তেন বললে ভুল হবে, বরং তিনি ক্লাস সেভেনে “বাস” করতেন বলাই যথার্থ। কেউ জানত না তিনি ঠিক কত বছর ধরে এই শ্রেণিতে রয়েছেন। এমনকি অনেক শিক্ষকও জানতেন না, কারণ কিছু শিক্ষক তো একসময় আদুভাইয়ের সহপাঠী ছিলেন!
তিনি ছিলেন স্কুলের সবচেয়ে নিয়মিত ছাত্র। প্রতিদিন সকালে শহরতলির বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল পথ হেঁটে স্কুলে আসতেন। চৈত্রের কালবৈশাখী হোক কিংবা শ্রাবণের মুষলধারে বৃষ্টি – কিছুই তাকে দমাতে পারত না। বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত দুটি পুরস্কার পেতেন: একটি নিখুঁত উপস্থিতির জন্য, অন্যটি ভালো চরিত্রের জন্য।
আদুভাইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তার অদম্য আশাবাদ। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে একদিন তিনি সব বিষয়ে “পাকা” হয়ে উঠবেন এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রমোশন পাবেন। যখন কেউ তাকে নকল বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরামর্শ দিত, তিনি রাগ করে বলতেন, “জ্ঞানলাভের জন্যই আমরা স্কুলে পড়ি, প্রমোশন লাভের জন্য পড়ি না।”
তিনি নিজেকে একজন কবি ও বক্তা মনে করতেন। স্কুলের সাপ্তাহিক সভায় তার আবেগময় কবিতা পাঠ ও বক্তৃতা শুনে সহপাঠীরা হাসত। কিন্তু আদুভাই সেই হাসিকে প্রশংসা হিসেবেই গ্রহণ করতেন, যা তার আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিত।
আমি যখন প্রথম ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলাম, তখনই আদুভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। আমি ছিলাম ক্লাসের সেরা ছাত্র, আর আদুভাই ছিলেন সবচেয়ে খারাপ। কিন্তু আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। আদুভাই আমাকে তার ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। তার এই স্নেহশীলতা ও সরলতা আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করত।
ঘটনার মোড় ঘুরল যখন আদুভাই একদিন আমাকে স্কুলের নির্জনে পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। জানা গেল, তার ছেলে এবার ক্লাস সেভেনে পাশ করেছে। আদুভাইয়ের স্ত্রী বলেছেন, হয় এবার তাকে প্রমোশন নিতে হবে, নয়তো স্কুল ছাড়তে হবে। এই সংকট আদুভাইকে সম্পূর্ণ বিচলিত করে তুলেছিল।
আমি আদুভাইয়ের জন্য শিক্ষকদের কাছে সুপারিশ করতে গিয়ে দেখলাম:
- ফারসির খাতায় তিনি পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে বাংলা লিখেছেন, তবু শিক্ষক ৩ নম্বরকে ৩৩ করে দিলেন
- অঙ্কের খাতায় তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লিখেছেন: “এই প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক, বরং এভাবে প্রশ্ন করা উচিত ছিল…”
- ভূগোলে লিখেছেন পৃথিবী গোলাকার নয়
- ইতিহাসে লিখেছেন রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস বিশ্বাসযোগ্য নয়
শিক্ষকরা বললেন, এমন ছাত্রকে কিছুতেই প্রমোশন দেওয়া যায় না।
হতাশ আদুভাই স্কুল গেটে এক আবেগময় বক্তৃতা দিলেন:
“আমি কখনো প্রমোশন চাইনি, কিন্তু এবার দিতেই হবে!
আমার ছেলে আমার ক্লাসে পাশ করেছে – এটা লজ্জার!
শিক্ষকরা হৃদয়হীন – একটা প্রমোশন দিলে তাদের কী ক্ষতি হবে?”
কয়েক বছর পর আমি আদুভাইয়ের একটি চিঠি পেলাম। জানলাম, তিনি অবশেষে ক্লাস এইটে প্রমোশন পেয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, প্রমোশনের আনন্দ উপভোগ করার আগেই তিনি মারা গেছেন। তার সমাধি ফলকে লেখা হয়েছে:
“এখানে শায়িত আছেন আদুমিঞা, যিনি ক্লাস সেভেন থেকে এইটে প্রমোশন পেয়েছিলেন।”
আরও পড়ুনঃ মামার বিয়ের বরযাত্রী গল্পের মূলভাব ও বিষয়বস্তু