সত্যজিৎ রায়ের “কাকতাড়ুয়া” গল্প শুধু ভূতের গল্প নয়—এটি সমাজের অন্ধকার দিক নিয়ে এক গভীর প্রতিবাদ। নিচে কাকতাড়ুয়া গল্পের মূলভাব ও বিষয়বস্তু দেওয়া হল।
কাকতাড়ুয়া গল্পের মূলভাব
সত্যজিৎ রায়ের “কাকতাড়ুয়া” গল্পে প্রখ্যাত সাহিত্যিক মৃগাঙ্কবাবু এক নির্জন মাঠে গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যাওয়ায় আটকে পড়েন। ড্রাইভার সুধীর পেট্রোল আনতে যাওয়ায় তিনি ঘন্টাখানেক একাকী সময় কাটাতে বাধ্য হন। মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাকতাড়ুয়া তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা ধীরে ধীরে অদ্ভুতভাবে নড়াচড়া করতে শুরু করে। হঠাৎ কাকতাড়ুয়াটি জীবন্ত হয়ে উঠে মৃগাঙ্কবাবুর সাবেক চাকর অভিরামের রূপ ধারণ করে। অভিরামের আত্মা তাকে জানায় যে তিন বছর আগে তাকে অন্যায়ভাবে চোর সন্দেহ করে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, যদিও সে সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল। মৃগাঙ্কবাবু বাড়ি ফিরে আলমারির নিচে খোঁজ নিয়ে সেই হারানো সোনার ঘড়িটি খুঁজে পেয়ে হতবাক হন। এই ঘটনা তাকে বুঝতে সাহায্য করে যে ওঝার কুলো-চাল পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা ভুল ছিল।
কাকতাড়ুয়া গল্পের বিষয়বস্তু
মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায় একজন বিখ্যাত লেখক। একদিন তিনি দুর্গাপুরে একটি অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। ট্রেনে টিকিট না পাওয়ায় মোটরগাড়িতে রওনা দেন। ফেরার পথে পানাগড়ের কাছে তাঁর গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যায়। ড্রাইভার সুধীর পেট্রোল আনতে পানাগড়ে যায়, যা কাছেই ছিল (৩ মাইল দূরে)। কিন্তু সুধীর ফিরতে ২-৩ ঘণ্টা লাগবে। মৃগাঙ্কবাবুকে তাই নির্জন মাঠের মধ্যে গাড়িতে একা অপেক্ষা করতে হয়।
এটি মাঘ মাস, চারদিকে শুধু ফাঁকা মাঠ, কয়েকটা কুঁড়েঘর আর দূরে তালগাছ। মাঠের মাঝে একটি কাকতাড়ুয়া (ডাকাত-ভীতির জন্য তৈরি মানবাকৃতির পুতুল) দাঁড়িয়ে আছে। মৃগাঙ্কবাবু বই পড়তে চেষ্টা করেন, কিন্তু মন বসে না। তিনি কাকতাড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
সন্ধ্যা হতে না হতেই মৃগাঙ্কবাবু লক্ষ করেন কাকতাড়ুয়াটা যেন নড়ছে! প্রথমে তিনি ভাবেন, তাঁর চোখের ভুল। কিন্তু পরে দেখেন, কাকতাড়ুয়াটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে! ভয়ে তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়।
হঠাৎ কাকতাড়ুয়াটি মানুষের গলায় কথা বলে ওঠে:
“বাবু! আমায় চিনতে পারছেন?”
মৃগাঙ্কবাবু চমকে যান—এটা তাঁদের সাবেক চাকর অভিরামের গলা!
অভিরাম মৃগাঙ্কবাবুর বাড়িতে ২০ বছর চাকরি করেছিল। একদিন মৃগাঙ্কবাবুর সোনার ঘড়ি চুরি হলে, অভিরামকে সন্দেহ করা হয়। মৃগাঙ্কবাবুর বাবা একজন ওঝা ডেকে কুলোতে চাল ছুড়ে “প্রমাণ” করেন যে অভিরামই চোর। অভিরাম চুরি অস্বীকার করলেও তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
কাকতাড়ুয়া রূপী অভিরামের আত্মা বলে:
“আমি নির্দোষ ছিলাম! চুরি করার পর ঘড়িটি আপনার আলমারির নিচে পড়ে ছিল। নতুন চাকর ভালো করে ঝাঁট দেয়নি, তাই কেউ দেখতে পায়নি। আমি ব্যারামে মরে গেছি, কিন্তু আমার আত্মা শান্তি পায়নি। আজ আপনাকে সত্য বলার জন্যই আমি এসেছি!”
মৃগাঙ্কবাবু ভয়ে কাঁপতে থাকেন। অভিরামের আত্মা বলে:
“ঘড়িটি পেলে আপনি বুঝবেন আমি মিথ্যা বলিনি। এখন আমি চলে যাব… নিশ্চিন্ত হলাম।”
এবং অন্ধকারে তা মিলিয়ে যায়।
হঠাৎ মৃগাঙ্কবাবুর ঘুম ভাঙে—ড্রাইভার সুধীর পেট্রোল নিয়ে ফিরেছে। তিনি বুঝতে পারেন, কাকতাড়ুয়ার সাথে কথোপকথন হয়তো তাঁর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বাড়ি ফিরে তিনি আলমারির নিচে সেই সোনার ঘড়ি খুঁজে পেয়ে হতবাক হন!
তখন তিনি বুঝতে পারেন, অভিরাম সত্যিই নির্দোষ ছিল। তিনি শপথ নেন: “আর কখনো ওঝা বা কুসংস্কারের সাহায্য নেব না।”
আরও পড়ুনঃ নয়া পত্তন গল্পের মূলভাব ও বিষয়বস্তু – জহির রায়হান