বন্দনা কবিতাটিতে কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর মা-বাবা, গুরু ও সম্প্রদায়ের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এটি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী ভক্তিমূলক রচনা। নিচে বন্দনা কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা দেওয়া হল।
বন্দনা কবিতার মূলভাব
শাহ মুহাম্মদ সগীরের ‘বন্দনা’ কবিতাটি একজন সন্তানের কৃতজ্ঞতাপূর্ণ স্বীকারোক্তি। যেখানে তিনি প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করে মা-বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। মা যেভাবে পিঁপড়ার ভয়েও তাকে মাটিতে নামাতেন না। সারাক্ষণ কোলে-বুকেই আগলে রাখতেন। বাবা নিজে না খেয়ে-না পরিয়ে তাকে খাওয়াতেন-পরাতেন, এমন অসংখ্য ত্যাগের কথা স্মরণ করেন। এরপর তিনি গুরুজনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। যারা তাকে জ্ঞান দিয়ে দ্বিতীয় জীবন দান করেছেন। সমাজের সকল লোকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং শেষে নিজেকে ‘হীন পাপী’ আখ্যা দিয়ে আল্লাহ ও সবার কাছে দোয়া চান। কবিতাটি আসলে আমাদের সকলকে শেখায় যে মা-বাবার সেবা, গুরুজনের সম্মান এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব – এই তিনটি মূল্যবোধই মানুষের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলে। আর এই শিক্ষাই কবি আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
বন্দনা কবিতার ব্যাখ্যা
কবিতার লাইন | লাইনের ব্যাখ্যা |
“দ্বিতীয়ে প্রণাম করো মাও বাপ পাএ” | এখানে কবি বলেছেন, আল্লাহর পরেই সবচেয়ে বেশি সম্মান পাওয়ার যোগ্য আমাদের মা-বাবা। আমরা যেমন নামাজে আল্লাহকে সিজদা করি, তেমনি মা-বাবার পায়েও শ্রদ্ধা জানানো উচিত। |
“যান দয়া হস্তে জন্ম হৈল বসুধায়” | আমাদের এই দুনিয়ায় আসার পেছনে মা-বাবার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাদের ভালোবাসা আর যত্নেই আমরা বেঁচে আছি। যেমন গাছের জন্য মাটি-পানি যেমন, আমাদের জন্য মা-বাবা তেমনই। |
“পিপিড়ার ভয়ে মাও না থুইলা মাটিত” | এখানে মায়ের অতিরিক্ত স্নেহের কথা বলা হয়েছে। মা সন্তানকে এতটাই আগলে রাখেন যে, ছোট্ট একটি পিঁপড়ার কামড়ের ভয়েও তাকে মাটিতে নামাতেন না। সারাক্ষণ কোলে-বুকেই রাখতেন। |
“কোল দিআ বুক দিআ জগতে বিদিত” | মায়ের এই ভালোবাসা সারা দুনিয়াতেই একই রকম। সব মাই তার সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করেন, বুক দিয়ে আগলে রাখেন। এটাই মায়ের স্বভাব, সব দেশে সব যুগেই। |
“অশক্য আছিলু মুই দুর্বল ছাবাল” | কবি বলছেন, ছোটবেলায় আমরা সবাই খুব দুর্বল ছিলাম। নিজে থেকে কিছুই করতে পারতাম না। খেতে হতো মায়ের হাত থেকে, ঘুমাতে হতো মায়ের কোলে। |
“তান দয়া হস্তে হৈল এ ধড় বিশাল” | এই যে আজ আমরা বড় হয়েছি, শক্তিশালী হয়েছি – সবই মা-বাবার যত্নের ফল। তারা আমাদের যেমন দুধ খাওয়িয়েছেন, তেমনি ভালোভাবে মানুষও করেছেন। |
“না খাই খাওয়াএ পিতা না পরি পরাএ” | বাবা নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়াতেন। নিজের জামা না কিনে সন্তানকে নতুন জামা দিতেন। এটাই বাবার ভালোবাসা, যে নিজের চেয়ে সন্তানকে আগে দেখেন। |
“কত দুক্ষে একে একে বছর গোঞাএ” | কত কষ্টে মা-বাবা আমাদের বড় করেছেন! এক একটা বছর পার হয়েছে তাদের পরিশ্রমে। অনেক রাত জেগে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করে তারা আমাদের লালন-পালন করেছেন। |
“পিতাক নেহায় জিউ জীবন যৌবন” | বাবা তার সবচেয়ে ভালো সময়টা, তার যৌবনটা আমাদের জন্য ব্যয় করেছেন। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে শুধু আমাদের কথা ভেবেছেন। এটাই বাবার মহত্ত্ব। |
“কনে বা সুধিব তান ধারক কাহন” | আমরা কখনই আমাদের মা-বাবার এই ঋণ শোধ করতে পারব না। যেমন একটা গাছ কখনই মাটির ঋণ শোধ করতে পারে না, তেমনি আমরা আমাদের মা-বাবার ভালোবাসার ঋণ শোধ করতে অক্ষম। |
“ওস্তাদে প্রণাম করোঁ পিতা হস্তে বাড়” | শিক্ষক বা গুরু হচ্ছেন আমাদের দ্বিতীয় পিতা। যেভাবে বাবা আমাদের শারীরিকভাবে বড় করেন, গুরু আমাদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন। তাই তাদেরও সমান সম্মান দেওয়া উচিত। |
“দোসর-জনম দিলা তিহ সে আহ্মার” | গুরুই আমাদের নতুন জীবন দেন। যেমন একটা অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালালে নতুন জীবন পাওয়া যায়, তেমনি গুরুই আমাদের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় নিয়ে আসেন। |
“আহ্মা পুরবাসী আছ জথ পৌরজন” | আমরা সবাই এক সমাজের অংশ। যেমন একটা গাঁয়ের সব লোক একসাথে বাস করে, তেমনি আমরা সবাই একে অপরের সাথে জড়িত। |
“ইষ্ট মিত্র আদি জথ সভাসদগণ” | আমাদের প্রিয় বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশী সবাই আমাদের জীবনের বিশেষ মানুষ। তারা আমাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন। |
“তান সভান পদে মোহার বহুল ভকতি” | আমার এই সব মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আছে। যেমন নদীর পানি সব গাছকে সমানভাবে সিঞ্চন করে, তেমনি আমার ভালোবাসাও সবার জন্য সমান। |
“সপুটে প্রণাম মোহার মনোরথ গতি” | আমি দুই হাত জোড় করে সবাইকে প্রণাম করছি। আমার একটাই ইচ্ছা – যেন সবাই ভালো থাকেন, সবাই সুখে থাকেন। |
“মুহম্মদ সগীর হীন বহোঁ পাপ ভার” | কবি মুহম্মদ সগীর নিজেকে ছোট মানুষ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, তিনি অনেক ভুল করেছেন, অনেক পাপ করেছেন। এটা তার বিনয়ের প্রকাশ। |
“সভানক পদে দোয়া মাগোঁ বার বার” | সব শেষে কবি সবাই কাছে দোয়া চাইছেন। তিনি বলছেন, “হে আল্লাহ, হে মানুষ সবাই, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো, আমাকে ভালো পথ দেখাও।” এটা তার সরল প্রার্থনা। |
আরও পড়ুনঃ কপোতাক্ষ নদ কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা