কাজী নজরুল ইসলামের “সাম্যবাদী” কবিতাটি ধর্ম, জাতি ও শ্রেণির ঊর্ধ্বে মানবতার জয়গান করে। নিচে সাম্যবাদী কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা প্রতি লাইনের দেওয়া হল।
সাম্যবাদী কবিতার মূলভাব
কাজী নজরুল ইসলামের “সাম্যবাদী” কবিতাটি মানুষের মাঝে সব বিভেদ ভুলে এক হওয়ার আহ্বান জানায়। কবি বলেন, যেখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই এক হয়ে গেছে, সেখানেই সাম্যের গান বাজে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ধর্মগ্রন্থ পড়েও মানুষ কেন বিভেদ বাড়ায়, যখন সব ধর্মই শেখায় ভালোবাসা। নজরুলের মতে, মানুষের হৃদয়ই সবচেয়ে বড় মন্দির, কারণ এখানেই কৃষ্ণ গীতার বাণী দিয়েছিলেন, বুদ্ধ জ্ঞান পেয়েছিলেন, মুহাম্মদ (স.) কোরানের জ্ঞান লাভ করেছিলেন। কবি বলছেন, মসজিদ-মন্দির-গির্জায় যাওয়ার চেয়ে মানুষের হৃদয়কে বুঝাই আসল ধর্ম। তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন সব ধরনের কৃত্রিম বিভেদের বিরুদ্ধে, কারণ রাজা-গরিব, উঁচু-নিচু সবাই সমান। এই কবিতার মূল বার্তা হলো – ধর্ম-বর্ণ-জাতি যাই হোক, সবাই মানুষ, আর এই মানুষকে ভালোবাসাই হলো ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় উপাসনা। নজরুল চান সবাই মিলেমিশে থাকুক, কারণ প্রকৃত শান্তি পেতে হলে সাম্যবাদী হতে হবে, আর এই সাম্যের গানই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
সাম্যবাদী কবিতার প্রতি লাইনের ব্যাখ্যা
কবিতার লাইন | লাইনের ব্যাখ্যা |
“গাহি সাম্যের গান-“ | নজরুল শুরু করছেন সাম্য বা সমতার গান গেয়ে। এখানে ‘সাম্য’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন – ধর্ম, বর্ণ, জাতি, শ্রেণী, লিঙ্গ সব ধরনের বৈষম্যহীন সমাজ। |
“যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,” | কবি এমন এক আদর্শ সমাজের কথা বলছেন যেখানে সব ধরনের বিভেদ (ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক) মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। |
“কে তুমি?-পার্সি? জৈন? ইহুদি? সাঁওতাল, ভীল, গারো?” | কবি এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও আদিবাসী গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করে প্রশ্ন রাখছেন – তুমি কে? এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় মুখ্য নয়। পার্সি (জরাথুস্ট্রিয়ান), জৈন, ইহুদি, সাঁওতাল, ভীল, গারো – সবাই সমান। |
“কনফুসিয়াস্? চার্বাক-চেলা? বলে যাও, বল আরও!” | এখানে নজরুল আরও কিছু দার্শনিক মতবাদকে সম্বোধন করছেন। কনফুসিয়াস (চীনা দার্শনিক) এবং চার্বাক (প্রাচীন ভারতীয় বস্তুবাদী দর্শন) এর অনুসারীদেরও তিনি এই সাম্যের ডাকে শরিক করছেন। ‘বলে যাও, বল আরও!’ – এই অংশে তিনি সকল মত ও পথকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। |
“পেটে-পিঠে, কাঁধে-মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,” | এখানে নজরুল বিদ্রূপ করছেন ধর্মগ্রন্থের অন্ধ অনুকরণের প্রতি। মানুষ যেন পেটে-পিঠে বই বয়ে বেড়ায়, কাঁধে ও মস্তিষ্কে শুধু ধর্মগ্রন্থের বোঝা চাপায়, কিন্তু প্রকৃত মানবতা চর্চা করে না। |
“কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-“ জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থ-সাহেব পড়ে যাও যত সখ, -“ | বিভিন্ন ধর্মের প্রধান গ্রন্থগুলোর নাম উল্লেখ করে নজরুল দেখাচ্ছেন যে সব ধর্মেরই নিজস্ব পবিত্র গ্রন্থ আছে, কিন্তু এই গ্রন্থগুলো মানুষকে বিভক্ত করার জন্য নয়, একত্রিত করার জন্য। |
“কিন্তু কেন এ পণ্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?” | এখানে কবি প্রশ্ন তুলছেন – কেন এই বৃথা পরিশ্রম? কেন ধর্মগ্রন্থ পড়ে মস্তিষ্কে কাঁটা (শূল) বসাচ্ছ? অর্থাৎ ধর্মগ্রন্থ পড়ে অহংকার বা বিদ্বেষ তৈরি করছ? |
“দোকানে কেন এ দর-কষাকষি? পথে ফোটে তাজা ফুল!” | লোকেরা ধর্মগ্রন্থ, পূজা-অর্চনা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে (দর কষাকষির মতো), অথচ প্রকৃত সত্য তো সবাইর জন্য উন্মুক্ত, যেমন রাস্তার ধারের ফুল সবার জন্য উন্মুক্ত। |
“তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,” | তুমি নিজের মধ্যেই সমস্ত ধর্মগ্রন্থের সারসংক্ষেপ খুঁজে পাবে। বাইরে ধর্মগ্রন্থ খুঁজতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। |
“সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!” | নজরুল এখানে আত্ম-উপলব্ধির কথা বলছেন। তিনি বলতে ধর্মগ্রন্থ মুখস্থ করার চেয়ে নিজের বিবেক-বুদ্ধি জাগ্রত করা গুরুত্বপূর্ণ। |
“তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার, তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকলের দেবতার।” | এখানে ‘দেউল’ অর্থ মন্দির। কবি বলছেন, তোমার হৃদয়ই সমগ্র বিশ্বের মন্দির, যেখানে সব ধর্মের দেবতা বাস করেন। অর্থাৎ ঈশ্বরের সন্ধান বাইরের মন্দির-মসজিদে নয়, মানুষের হৃদয়েই। |
“কেন খুঁজে ফের দেবতা-ঠাকুর মৃত-পুঁথি-কঙ্কালে?” | নজরুল এখানে ধর্মাচারের বাহ্যিক রূপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ‘মৃত-পুঁথি-কঙ্কালে’ বলতে তিনি ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যা ও মূর্তিপূজাকে বোঝাচ্ছেন, যাকে তিনি ‘মৃত’ বলে অভিহিত করেছেন কারণ এগুলোতে জীবনীশক্তি নেই। তাঁর প্রশ্ন – কেন মানুষ ঈশ্বর খোঁজে এই জীবনহীন রীতিনীতিতে? |
“হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে।” | এখানে কবি বলছেন, ঈশ্বর বাইরের ধর্মানুষ্ঠানে নন, বরং মানুষের হৃদয়ের গভীরে (‘অমৃত-হিয়া’ বা অমৃতসমান পবিত্র হৃদয়ের অন্তরালে) বিরাজ করেন। ‘হাসিছেন’ শব্দটি ব্যবহার করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ঈশ্বর মানুষের এই বাহ্যিক অন্বেষণ দেখে যেন মৃদু হাসছেন। |
“বন্ধু, বলিনি ঝুট,” | নজরুল এখানে স্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন যে তিনি কোনো মিথ্যা (‘ঝুট’) কথা বলছেন না। এটি একটি রীতিমতো ঘোষণা যে তিনি যা বলছেন তা গভীর সত্য। |
“এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট” | ‘রাজমুকুট’ এখানে ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক। কবি বলছেন, এই হৃদয়-মন্দিরে এসে সব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক সত্যের কাছে সবকিছু তুচ্ছ। |
“এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,” | নজরুল এখানে হিন্দুধর্মের পবিত্র তীর্থস্থানগুলোর নাম উল্লেখ করে বলছেন, এ সমস্ত স্থানের পবিত্রতা মানুষের হৃদয়েই নিহিত। ‘নীলাচল’ (জগন্নাথধাম), ‘কাশী’, ‘মথুরা’, ‘বৃন্দাবন’ – এগুলো বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ হৃদয়ই সবচেয়ে বড় তীর্থ। |
“বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন,” | এখানে তিনি অন্যান্য ধর্মের পবিত্র স্থানগুলোর কথা বলেছেন: বৌদ্ধধর্মের বোধিগয়া, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জেরুজালেম, ইসলামের মদিনা ও কাবা। তাঁর বক্তব্য, এই সব স্থানের আধ্যাত্মিকতা মানুষের হৃদয়েই রয়েছে। |
“মজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,” | স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছেন যে মসজিদ, মন্দির বা গির্জা – সব ধর্মের উপাসনালয় আসলে মানুষের হৃদয়। বাহ্যিক স্থাপনা নয়, অন্তরের পবিত্রতাই আসল। |
“এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।” | খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের প্রবক্তা যীশু (ঈসা) ও মূসা (মুসা) তাদের সত্য উপলব্ধি করেছিলেন এই হৃদয়-গভীরেই বসে। অর্থাৎ, সব ধর্মগুরুই অন্তর্নিহিত সত্য আবিষ্কার করেছেন। |
“এই রণ-ভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,” | ‘বাঁশির কিশোর’ শ্রীকৃষ্ণ, যিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে (‘রণ-ভূমে’) অর্জুনকে গীতা জ্ঞান দিয়েছিলেন। নজরুল বলছেন, এই গীতার জ্ঞান মানুষের অন্তর্যুদ্ধের প্রতীক। |
“এই মাঠে হলো মেঘের রাখাল নবিরা খোদার মিতা।” | ‘মেঘের রাখাল’ শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম, আর ‘নবিরা খোদার মিতা’ বলতে ইসলামের নবী-রাসুলদের বোঝানো হয়েছে। কবির মতে, সব ধর্মের শিক্ষাই মানুষের হৃদয়-মাঠে (‘এই মাঠে’) জন্ম হয়েছে। |
“এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি” | গৌতম বুদ্ধ (‘শাক্যমুনি’) এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহায় বসেই জ্ঞান লাভ করেছিলেন। ‘ধ্যান-গুহা’ বলতে হৃদয়ের গভীরতাকে বোঝানো হয়েছে। |
“ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি।” | বুদ্ধ রাজ্য ত্যাগ করেছিলেন মানুষের দুঃখ (‘মহা-বেদনা’) দেখে। নজরুল বলছেন, এই বেদনার ডাকও মানুষের হৃদয় থেকেই উঠেছিল। |
“এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,” | ‘আরব-দুলাল’ হজরত মুহাম্মদ (স.), যিনি ‘কন্দরে’ (পাহারের গুহায়) আল্লাহর ডাক শুনেছিলেন। কবি বলছেন, এই ডাক মানুষের হৃদয়-গুহাতেই ধ্বনিত হয়েছিল। |
“এইখানে বসি গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান।” | ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরানের ‘সাম-গান’ (সমতার গান) নবী মুহাম্মদ (স.) এই হৃদয়-আসনেই গেয়েছিলেন। অর্থাৎ, কোরানের মৌলিক বার্তাও মানুষের অন্তর থেকে আসা। |
“মিথ্যা শুনিনি ভাই,” “এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।” | একজন বন্ধুর মতো (‘ভাই’) সম্বোধন করে নজরুল জোর দিয়ে বলছেন, তিনি কোনো মিথ্যা কথা বলেননি। চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ঘোষণা করছেন যে, মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো ধর্মীয় স্থান (হিন্দু মন্দির বা ইসলামের কাবা) নেই। সব ধর্মের চিরসত্য মানুষের হৃদয়েই নিহিত। |
আরও পড়ুনঃ বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা