আহসান হাবীবের “সেই অস্ত্র” কবিতায় কবি ভালোবাসাকে এমন এক শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা কোনোভাবেই বিফল হয় না। নিচে সেই অস্ত্র কবিতার মূলভাব, ব্যাখ্যা ও MCQ প্রশ্ন উত্তর দেওয়া হল।
Table of Contents
সেই অস্ত্র কবিতার মূলভাব
আহসান হাবীবের “সেই অস্ত্র” কবিতাটি মানবতার জয়গান করে, যেখানে কবি ভালোবাসাকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কবি বলছেন, এই বিশেষ অস্ত্রটি ফিরে পেলে যুদ্ধের সব অস্ত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে, প্রকৃতি আবার সজীব হবে – গাছপালা সবুজ হবে, নদী কলতান করবে, পাখিরা নিরাপদে বাসা বাঁধবে। ফসলের মাঠে আর আগুন লাগবে না, মানুষের ঘরবাড়ি খালি পড়ে থাকবে না, আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ বন্ধ হবে। কবি ট্রয় নগরীর উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে হিংসা বারবার সভ্যতাকে ধ্বংস করে, আর জাত্যাভিমান, লোভ আর ঘৃণা মানুষকে বিভক্ত করে রাখে। তাঁর মতে, ভালোবাসাই একমাত্র শক্তি যা এই বিভেদ ভুলিয়ে মানুষকে এক করতে পারে, যুদ্ধের বিভীষিকা থামাতে পারে, পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। কবিতাটি আসলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বের জন্য কবির একটি প্রার্থনা – যেখানে অস্ত্রের জবাব অস্ত্রে না দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে শত্রুতাকে পরাজিত করা যায়। আজকের যুদ্ধকবলিত বিশ্বে কবির এই বার্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, যেখানে মানবতা প্রতিনিয়ত হিংসার কাছে হার মানছে। কবি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে ,প্রকৃত শক্তি ধ্বংসের মধ্যে নয়, সৃষ্টির মধ্যে, ভালোবাসার মধ্যে নিহিত। এই কবিতা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে শান্তির বীজ বপন করে, আমাদেরকে এক অসামান্য প্রশ্নের মুখোমুখি করে – আমরা কি আমাদের সন্তানদের জন্য এমন পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি যেখানে ভালোবাসাই হবে একমাত্র অস্ত্র?
সেই অস্ত্র কবিতার ব্যাখ্যা
কবিতার লাইন | লাইনের ব্যাখ্যা |
“আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও” | কবি আসলে কোনো রাইফেল বা বোমা চাইছেন না। তিনি চাইছেন ভালোবাসার শক্তি, যা দিয়ে সব যুদ্ধ-ঝগড়া থামানো যায়। এটা এমন একটা জিনিস যা আগে পৃথিবীতে ছিল, এখন হারিয়ে গেছে। |
“সভ্যতার সেই প্রতিশ্রুতি” | মানুষ যখন সভ্য হয়েছিল, তখন সবাই মিলেমিশে থাকার কথা বলেছিল। কিন্তু এখন সেটা ভুলে গেছে। কবি সেই পুরনো কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। |
“সেই অমোঘ অনন্য অস্ত্র” | ‘অমোঘ’ মানে যা কখনো ফেল করে না। ভালোবাসা এমন একটা জিনিস যা সবসময় কাজ করে। এটা একদম আলাদা, এর কোনো জুড়ি নেই। |
“পৃথিবীর যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত” | যদি এই ভালোবাসার অস্ত্রটা সবাই ব্যবহার করে, তাহলে ট্যাংক, মিসাইল, বন্দুক – সব অস্ত্রই আর কাজ করবে না। যেন সেগুলো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। |
“অরণ্য হবে আরও সবুজ” | যুদ্ধ বন্ধ হলে গাছপালা নিরাপদে বড় হবে। বনের সবুজ রং আরও তাজা হয়ে উঠবে। যুদ্ধে যে সব গাছ পুড়ে যায়, সেটা আর হবে না। |
“নদী আরও কল্লোলিত” | নদী তখন স্বাভাবিকভাবে বইবে, তার জলে আর তেল বা রাসায়নিক পড়বে না। নদীর কলকল শব্দ আবার শোনা যাবে। |
“পাখিরা নীড়ে ঘুমোবে” | পাখিরা তখন ভয় পাবে না, নিরাপদে গাছে বাসা বানাবে। বোমার শব্দে তাদের আর ঘুম ভাঙবে না। |
“যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে ফসলের মাঠে আগুন জ্বলবে না” | কবি বলছেন, যদি আমরা সেই ভালোবাসার অস্ত্র ব্যবহার করি, তাহলে কৃষকের ফসলের মাঠে আর যুদ্ধের কারণে আগুন লাগবে না। আজকে যেমন যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষ ফসল জ্বালিয়ে দেয়, সেটা বন্ধ হবে। কৃষকরা নিরাপদে তাদের ফসল ফলাতে পারবে। |
“খাঁ খাঁ করবে না গৃহস্থালি” | ‘খাঁ খাঁ’ শব্দে বাড়িঘর খালি পড়ে থাকার শব্দ বোঝায়। যুদ্ধের সময় মানুষ বাড়ি ছেড়ে পালায়, ফলে ঘরগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। কবি চান, মানুষের বাসস্থান আবার প্রাণবন্ত হোক, কেউ যেন ঘর ছাড়া না হয়। |
“নক্ষত্রখচিত আকাশ থেকে আগুন ঝরবে না” | এখানে ‘নক্ষত্রখচিত আকাশ’ বলতে রাতের তারা ভরা সুন্দর আকাশ বোঝানো হয়েছে। কিন্তু সেই আকাশ থেকেই আজকে যুদ্ধের সময় বোমা পড়ে (‘আগুন ঝরবে’)। কবি চান, আকাশ শুধু সৌন্দর্যের জন্যই থাকুক, ধ্বংসের জন্য নয়। |
“মানব বসতির বুকে মুহূর্তের অগ্ন্যুৎপাত” | হঠাৎ করে শহর বা গ্রামে বোমা পড়লে যেমন সবকিছু একসাথে ধ্বংস হয়ে যায়, সেটাই এখানে ‘অগ্ন্যুৎপাত’ দিয়ে বোঝানো হয়েছে। কবি বলছেন, এই হঠাৎ হামলা যেন না ঘটে। |
“লক্ষ লক্ষ মানুষকে করবে না পঙ্গু-বিকৃত” | যুদ্ধে অনেক মানুষ পঙ্গু হয়, শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। কবি এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে চান। |
“আমাদের চেতনা জুড়ে তারা করবে না আর্তনাদ” | যুদ্ধের স্মৃতি মানুষের মনে দাগ কাটে। কবি বলছেন, এই মানসিক আঘাত (‘আর্তনাদ’) যেন আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে বিষাক্ত না করে। |
“সেই অস্ত্র যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে বার বার বিধ্বস্ত হবে না ট্রয়নগরী” | এখানে ‘ট্রয়নগরী’ গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত শহর, যা বারবার যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছিল। কবি বলছেন, ভালোবাসার অস্ত্র থাকলে ট্রয়ের মতো শহর আর বারবার ধ্বংস হবে না। মানে ইতিহাসের ভুলগুলো আমরা আবার করব না। |
“আমি সেই অবিনাশী অস্ত্রের প্রত্যাশী” | ‘অবিনাশী’ মানে যা কখনো নষ্ট হয় না। কবি চিরকাল টিকে থাকা এমন শক্তি চান – যা হলো ভালোবাসা। |
“যে ঘৃণা বিদ্বেষ অহংকার এবং জাত্যভিমানকে করে বার বার পরাজিত” | কবি ভালোবাসার মাধ্যমে চারটি জিনিস হারাতে চান: ১। ঘৃণা (একজন আরেকজনকে না ঘৃণা করা) ২। বিদ্বেষ (মনের কষ্ট জমিয়ে না রাখা) ৩। অহংকার (নিজেকে বড় না ভাবা) ৪। জাত্যভিমান (জাতি/গোত্র নিয়ে অহংকার) |
“যে অস্ত্র আধিপত্যের লোভকে করে নিশ্চিহ্ন” | এক দেশ অন্য দেশকে শাসন করতে চায়, এই লোভ (‘আধিপত্য’) সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে চান কবি। |
“যে অস্ত্র মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে না, করে সমাবিষ্ট” | ভালোবাসা মানুষকে আলাদা করে না, বরং এক করে। যেমন: ধর্মে ধর্মে ভেদাভেদ ঘোচায় জাতিতে জাতিতে ভুলে যায় সবাইকে এক পরিবার করে তোলে |
“সেই অমোঘ অস্ত্র-ভালোবাসা পৃথিবীতে ব্যাপ্ত করো” | শেষ লাইনে কবি সরাসরি বলেছেন: সেই অস্তর নাম ‘ভালোবাসা’। তিনি চান এই ভালোবাসা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ুক। |
সেই অস্ত্র কবিতার mcq
প্রশ্ন ১: “সেই অস্ত্র” কবিতায় কবি কোন অস্ত্র ফিরিয়ে চেয়েছেন?
ক. তরবারি
খ. বন্দুক
গ. ভালোবাসা
ঘ. পারমাণবিক বোমা
✅ সঠিক উত্তর: গ. ভালোবাসা
প্রশ্ন ২: “অমোঘ অস্ত্র” বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
ক. যা কখনো ব্যর্থ হয় না
খ. সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র
গ. প্রাচীন যুদ্ধাস্ত্র
ঘ. রাজনৈতিক শক্তি
✅ সঠিক উত্তর: ক. যা কখনো ব্যর্থ হয় না
প্রশ্ন ৩: কবিতায় “ট্রয়নগরী” উল্লেখের উদ্দেশ্য কী?
ক. প্রাচীন সভ্যতার গৌরব বর্ণনা
খ. যুদ্ধের চিরন্তন ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীক
গ. গ্রিক স্থাপত্যের প্রশংসা
ঘ. পুরাকথার প্রতি কবির আকর্ষণ
✅ সঠিক উত্তর: খ. যুদ্ধের চিরন্তন ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীক
প্রশ্ন ৪: “ফসলের মাঠে আগুন জ্বলবে না”—এই লাইনের অর্থ কী?
ক. কৃষকেরা ফসল পোড়াবে না
খ. ভালোবাসা থাকলে শোষণ ও বিদ্রোহ থাকবে না
গ. প্রকৃতিতে দাবানল হবে না
ঘ. শীতকালে ফসল রক্ষা করা হবে
✅ সঠিক উত্তর: খ. ভালোবাসা থাকলে শোষণ ও বিদ্রোহ থাকবে না
প্রশ্ন ৫: “নক্ষত্রখচিত আকাশ থেকে আগুন ঝরবে না” – কবি কী বুঝিয়েছেন?
i. মহাকাশযুদ্ধের ভয়াবহতা
ii. পারমাণবিক বোমার হুমকি
iii. প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) i ও iii
গ) ii ও iii
ঘ) i, ii ও iii
✅ সঠিক উত্তর: ক) i ও ii
প্রশ্ন ৬: কবি কোনটি দূর করতে চান?
ক. প্রযুক্তির উন্নতি
খ. ঘৃণা, বিদ্বেষ ও জাত্যভিমান
গ. শিল্পকলার বিকাশ
ঘ. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
✅ সঠিক উত্তর: খ. ঘৃণা, বিদ্বেষ ও জাত্যভিমান
প্রশ্ন ৭: “যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে অরণ্য হবে আরও সবুজ”—এখানে অস্ত্রের প্রভাব কী?
ক. প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা
খ. বন উজাড় করা
গ. শিকারের সুবিধা
ঘ. কৃষির উন্নতি
✅ সঠিক উত্তর: ক. প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা
প্রশ্ন ৮: কবি “সেই অস্ত্র” দ্বারা কী প্রত্যাশা করেছেন?
i. মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা
ii. সমাজ থেকে হিংসা দূরীকরণ
iii. বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) ii ও iii
গ) i ও iii
ঘ) i, ii ও iii
✅ সঠিক উত্তর: ঘ) i, ii ও iii
প্রশ্ন ৯: আহসান হাবীবের এই কবিতা কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
ক. ছায়াহরিণ
খ. বিদীর্ণ দর্পণে মুখ
গ. মরকত কোথায়
ঘ. পাতালপুরীর সারথি
✅ সঠিক উত্তর: খ. বিদীর্ণ দর্পণে মুখ
প্রশ্ন ১০: “সমাবিষ্ট” শব্দের অর্থ কী?
ক. বিচ্ছিন্ন
খ. সমবেত বা ঐক্যবদ্ধ
গ. আক্রান্ত
ঘ. বিরক্ত
✅ সঠিক উত্তর: খ. সমবেত বা ঐক্যবদ্ধ
প্রশ্ন ১১: কবিতায় “গৃহস্থালি খাঁ খাঁ করবে না” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
i. যুদ্ধে ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ার চিত্র
ii. শান্তিপূর্ণ পরিবেশের অভাব
iii. জনশূন্য নগরের করুণ দশা
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) i ও iii
গ) ii ও iii
ঘ) i, ii ও iii
✅ সঠিক উত্তর: ঘ) i, ii ও iii
প্রশ্ন ১২: “জাত্যভিমান” শব্দটি দ্বারা কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
i. গোঁড়া জাতীয়তাবাদ
ii. অন্য জাতিকে ঘৃণা করার মনোভাব
iii. নিজ জাতিকে শ্রেষ্ঠ ভাবার অহংকার
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) ii ও iii
গ) i ও iii
ঘ) i, ii ও iii
✅ সঠিক উত্তর: ঘ) i, ii ও iii